একসময় নীলফামারী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের নাম শুনলেই মানুষের মনে ভেসে উঠত অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, দুর্গন্ধ, দীর্ঘ অপেক্ষা আর সেবায় নানা ভোগান্তির চিত্র। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড, করিডোর ও ড্রেনে জমে থাকত ময়লা-আবর্জনা। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগও ছিল নিত্যদিনের।
তবে কয়েক মাসের ব্যবধানে হাসপাতালটির সেই চিত্রে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। এখন হাসপাতালের পরিবেশ অনেকটাই পরিচ্ছন্ন, সেবায় এসেছে শৃঙ্খলা এবং কমেছে রোগীদের অভিযোগ। নিয়মিত তদারকি, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, সেবার মানোন্নয়ন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগে এই পরিবর্তন এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
হাসপাতালটির উপপরিচালক ডা. আব্দুল্লাহেল মাফি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে নিয়মিত পরিদর্শন করে সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, আগে ডায়রিয়া ওয়ার্ডের পাশে যেখানে ময়লার স্তূপ ও দুর্গন্ধ ছিল, সেখানে এখন তৈরি হয়েছে ছোট একটি ফুলের বাগান। ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে। ওয়ার্ড, বারান্দা ও হাসপাতালের আঙিনায়ও পরিচ্ছন্নতার ছাপ দেখা গেছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতি মাসে ১৪০ থেকে ১৫০টি স্বাভাবিক প্রসব এবং ৪০ থেকে ৫০টি সিজারিয়ান অপারেশন হচ্ছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৩০০ রোগী চিকিৎসাসেবা ও বিনামূল্যে ওষুধ নিচ্ছেন। ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী ভর্তি থাকেন। অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলেও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
চিকিৎসাসেবা আরও আধুনিক ও সহজলভ্য করতে গাইনি ওয়ার্ডে রোগীদের জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাম সেবা চালু করা হয়েছে। অস্ত্রোপচারের সুবিধাও উন্নত করা হয়েছে এবং যুক্ত হয়েছে নতুন চিকিৎসা সরঞ্জাম। এ ছাড়া আইসিইউ ও কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট চালুর প্রস্তুতি চলছে। তবে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এসব সেবা এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি।
বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রহিমা বেগম বলেন, “আগে চিকিৎসকের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। এখন সিরিয়াল অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা পাচ্ছি।”
হাসপাতালে ভর্তি সালাম বলেন, “আগের তুলনায় হাসপাতাল এখন অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। দুর্গন্ধ নেই। চিকিৎসা নিয়েও আমরা সন্তুষ্ট।”
আরেক রোগী নাজমা বেগম বলেন, “এবার চিকিৎসা নিতে এসে বাইরে থেকে কোনো ওষুধ কিনতে হয়নি। হাসপাতালেই সব ওষুধ পেয়েছি। গরিব মানুষের জন্য এটি অনেক বড় স্বস্তি।”
হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আব্দুল্লাহেল মাফি বলেন, “সরকারি হাসপাতালের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। আমি যোগদানের পর থেকেই পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও রোগীবান্ধব সেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। প্রতিদিন হাসপাতালের প্রতিটি বিভাগ পরিদর্শন করি। কোথাও কোনো অনিয়ম বা অবহেলা দেখলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।”
তিনি বলেন, “আমাদের হাসপাতালে শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। তারপরও চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে আইসিইউ ও কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। জনবল সংকট দূর হলে এসব সেবা দ্রুত চালু করা সম্ভব হবে।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের লক্ষ্য শুধু চিকিৎসা দেওয়া নয়, রোগীরা যেন পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও মানবিক পরিবেশে চিকিৎসা পান, সেটিও নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালকে উত্তরাঞ্চলের একটি আদর্শ সরকারি হাসপাতালে পরিণত করতে আমরা কাজ করছি।”
স্থানীয়দের মতে, সরকারি হাসপাতালের সেবার মান বাড়াতে সঠিক নেতৃত্ব, নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতার বিকল্প নেই। নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালের সাম্প্রতিক পরিবর্তন তারই একটি উদাহরণ। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে জেলার মানুষের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা আরও বাড়বে।