
শহর থেকে গ্রাম, জেলা থেকে উপজেলা সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরেই মাদকের বিস্তার আজ গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একসময় মাদকাসক্তিকে বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে এটি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় সংকট। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, মাদকের ছোবলে বিপথগামী হচ্ছে দেশের লাখো তরুণ ও যুবক, যাদের ওপর নির্ভর করছে আগামী দিনের বাংলাদেশ।
মাদকের ভয়াবহতা শুধু একজন ব্যক্তির জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন তরুণ যখন মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ে, তখন তার শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে বিপর্যস্ত হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নেশার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে কেউ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, কেউ পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করে, আবার কেউ নিজের সম্ভাবনাময় জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারের ওপর।
বর্তমানে শহরের পাশাপাশি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও বিভিন্ন ধরনের মাদকের বিস্তার উদ্বেগজনক। সীমান্তবর্তী এলাকা, পরিবহনব্যবস্থা এবং প্রযুক্তির অপব্যবহারের সুযোগ নিয়ে মাদক কারবারিরা নতুন নতুন উপায়ে তরুণদের কাছে মাদক পৌঁছে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমও কখনো কখনো মাদক সরবরাহের নেটওয়ার্ক বিস্তারে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে শুধু অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা কঠিন।
মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে মাদকের উৎস, সরবরাহের পথ এবং অর্থের লেনদেনের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তবে শুধু গ্রেপ্তার ও শাস্তির মাধ্যমে মাদক সমস্যার পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, সচেতনতা এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত উদ্যোগ।
বিশেষ করে পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে কি না এসব বিষয়ে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল নজরদারি প্রয়োজন। তবে শাসনের পাশাপাশি সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাও জরুরি। কারণ অনেক তরুণ হতাশা, একাকিত্ব, পারিবারিক অশান্তি কিংবা ভুল বন্ধুত্বের কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়, মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা দিতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, স্বেচ্ছাসেবা ও সৃজনশীল কাজে তরুণদের সম্পৃক্ত করার সুযোগ বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাও জরুরি। কারণ বেকারত্ব, হতাশা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেক তরুণকে সহজেই বিপথে ঠেলে দিতে পারে।
আর যারা ইতোমধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সবাইকে অপরাধী হিসেবে দূরে ঠেলে না দিয়ে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। মাদকাসক্তি অনেক ক্ষেত্রে একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। তাই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং পরিবার ও সমাজের সহযোগিতার মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা সরকারের দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গণমাধ্যম এবং সমাজের সচেতন নাগরিক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই সংকট মোকাবিলা করতে।
আজকের একজন তরুণ শুধু একটি পরিবারের সন্তান নন; তিনি আগামী দিনের কর্মী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষক কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী নাগরিক। তাই তাদের জীবনকে মাদকের অন্ধকারে হারিয়ে যেতে দেওয়া মানে দেশের ভবিষ্যৎকে দুর্বল করে দেওয়া।
মাদকের বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অভিযান চলবে, আইন প্রয়োগ হবে, কিন্তু তার পাশাপাশি তৈরি করতে হবে এমন একটি সমাজ যেখানে তরুণদের সামনে নেশার পথ নয় শিক্ষা, কর্মসংস্থান, খেলাধুলা, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত থাকবে। একটি সুস্থ, মাদকমুক্ত প্রজন্মই পারে একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।