
ওষুধ মানুষের জীবন রক্ষার অন্যতম প্রধান উপকরণ। অসুস্থতা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার আশায় মানুষ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ কেনে। কিন্তু সেই ওষুধই যদি হয় নকল, ভেজাল কিংবা নিম্নমানের, তাহলে চিকিৎসার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হওয়ার পাশাপাশি রোগীর জীবনও পড়তে পারে ভয়াবহ ঝুঁকিতে। উদ্বেগের বিষয়, দেশের ওষুধের বাজারে নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিস্তার নিয়ে বারবার অভিযোগ উঠছে। রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলের ওষুধের দোকানগুলোতে এমন অনিয়মের অভিযোগ জনস্বাস্থ্যের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো অসাধু ব্যবসায়ী নামি ওষুধ কোম্পানির পণ্যের মতো দেখতে লেবেল ও মোড়ক ব্যবহার করে নকল ওষুধ বাজারজাত করছেন।
তুলনামূলক কম দামে এসব ওষুধ বিক্রির কারণে ক্রেতারা অনেক সময় প্রতারিত হচ্ছেন। বিশেষ করে সাধারণ মানুষ ওষুধের প্রকৃত মান যাচাই করতে না পারায় সহজেই প্রতারণার শিকার হন। অথচ যে ওষুধ রোগ নিরাময়ের আশায় কেনা হচ্ছে, তা কার্যকর না হলে রোগীর সুস্থতা বিলম্বিত হতে পারে, রোগের জটিলতা বাড়তে পারে, এমনকি জীবনহানির আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
নকল ও ভেজাল ওষুধের ক্ষতি শুধু আর্থিক প্রতারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ওষুধে প্রয়োজনীয় সক্রিয় উপাদান না থাকা, ভুল মাত্রায় উপাদান ব্যবহার কিংবা ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি রোগীর জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এর ফলে চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। ইনজেকশন, ইনহেলার ও ত্বকে ব্যবহারের ওষুধের ক্ষেত্রে মান ও নিরাপত্তার ঘাটতি আরও গুরুতর পরিণতি সৃষ্টি করতে পারে। তাই ওষুধের মান নিয়ে কোনো ধরনের আপস করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের ওষুধশিল্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশের উৎপাদিত ওষুধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে এবং এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কিন্তু এই সাফল্যের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের বিস্তার ঘটলে তা পুরো শিল্পের সুনামকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। একটি শক্তিশালী ওষুধশিল্পের প্রকৃত সাফল্য তখনই নিশ্চিত হবে, যখন দেশের প্রতিটি নাগরিকও নিরাপদ ও মানসম্মত ওষুধ পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবেন।
এ ক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ উৎপাদন, আমদানি, সংরক্ষণ, সরবরাহ ও বিক্রির প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। লাইসেন্সবিহীন ওষুধের দোকান, অবৈধ উৎপাদনকারী এবং নকল ওষুধের সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে সাময়িক সাফল্য অর্জন করলেই চলবে না; অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা এবং শাস্তি নিশ্চিত করাও জরুরি। একই সঙ্গে ওষুধের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগারগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো, বাজার থেকে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
ওষুধের বাজারে অনিয়ম বন্ধ করতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবেশক, পাইকারি বিক্রেতা ও খুচরা বিক্রেতাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্য নকল করা হলে কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে নিম্নমানের ওষুধ, নকল ওষুধ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিষয়গুলোকে পৃথকভাবে শনাক্ত করে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি। এতে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে।
পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ওষুধ কেনার সময় প্যাকেটের অক্ষত অবস্থা, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম এবং প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সম্ভব হলে অনুমোদিত ও বিশ্বস্ত ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনতে হবে এবং সন্দেহজনক ওষুধের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। তবে ওষুধের আসল-নকল শনাক্ত করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব সাধারণ ক্রেতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ নকল ওষুধের মোড়কও অনেক সময় আসল পণ্যের মতো হতে পারে। এ জন্য কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদারকি ও নির্ভরযোগ্য যাচাইব্যবস্থা অপরিহার্য।
মনে রাখতে হবে, ওষুধ সাধারণ কোনো ভোগ্যপণ্য নয়; এটি মানুষের জীবন ও সুস্থতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ খাতে অসাধু ব্যবসায়ীদের মুনাফার লোভ কোনোভাবেই জনস্বাস্থ্যের চেয়ে বড় হতে পারে না। নকল ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হলে সরকারের কঠোর অবস্থান, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং জনসচেতনতা, এই তিনটির সমন্বয় প্রয়োজন।
আমরা চাই, দেশের প্রতিটি মানুষ যেন নিরাপদ, কার্যকর ও মানসম্মত ওষুধ পাওয়ার নিশ্চয়তা পান। ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে অভিযান যেন লোকদেখানো কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং নিয়মিত তদারকি ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং মানুষের জীবন বাঁচানোর স্বার্থে নকল, ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।