সানোয়ার হোসেন বাদশা:
নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলায় সরকারি নিয়মনীতি ও প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দেদারছে চলছে ফসলি জমির উর্বর মাটি কাটা।
স্থানীয় বালুমহল ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কৃষিজমির উপরিভাগের ৫ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত মাটি কেটে অন্যত্র বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এ কর্মকাণ্ডের নেতৃত্বে সুমন নামে এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এতে একদিকে যেমন কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে মাটিবাহী টলির চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার আবাদি জমি থেকে একের পর এক মাটি কেটে টলিতে করে বিভিন্ন ইটভাটা ও অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, শুরুতে কৃষকদের অধিক অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে মাটি বিক্রিতে রাজি করানো হয়। পরে ওই জমির পাশাপাশি অন্য কৃষকদের জমিতেও মাটি কাটার কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এতে একপর্যায়ে অনিচ্ছুক অনেক কৃষকও প্রভাবিত হয়ে মাটি বিক্রিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
রোববার (৮ নভেম্বর) উপজেলার খুটামারা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে হক অ্যান্ড সন্স ইটভাটা-সংলগ্ন এলাকায় প্রায় এক একর ফসলি জমির মাটি কাটার চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ এক মাস ধরে ওই এলাকায় মাটি কাটার কার্যক্রম চলছে। এতে আশপাশের জমির মালিকরা পড়েছেন বিপাকে। বিশেষ করে যেসব কৃষকের জমির পাশের জমি কেটে গভীর করা হচ্ছে, তাদের জমির ভাঙন ও ভবিষ্যৎ ফসল উৎপাদন নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুমহল ব্যবসায়ীদের একটি প্রভাবশালী চক্র স্থানীয় দলীয় নেতাদের নাম ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ চক্রের সঙ্গে সুমন নামে এক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তুলেছেন তারা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে মাটিবাহী টলির অবাধ চলাচলে গ্রামীণ সড়কগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভারী টলির চাকায় পিষ্ট হয়ে ছোট-বড় সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি ফসল উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই মাটি কেটে নেওয়ায় জমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। স্থানীয় কৃষকরা দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, শুধু মাটি কাটার স্থান বন্ধ করলেই হবে না, এর সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ বিষয়ে জলঢাকা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. হাবিবুর রহমান বলেন, “মাটি কাটার ব্যাপারে আমাদের আইনি ব্যবস্থা অব্যাহত আছে। গণমাধ্যমে উঠে আসা চিহ্নিত স্থানগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস হ্যাপি বলেন, “নিয়মনীতি ও আইন উপেক্ষা করে কোনো কৃষক তার জমির মাটি বালু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে পারেন না। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। বিষয়টি যেহেতু আপনার মাধ্যমে অবগত হয়েছি, তাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সচেতন মহলের দাবি, কৃষিজমির উর্বর মাটি রক্ষায় প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারি, অবৈধ মাটি কাটার স্থানগুলোতে অভিযান এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় মুনাফার লোভে এভাবে ফসলি জমির মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।