প্রিন্ট এর তারিখঃ মে ২১, ২০২৬, ৮:১৩ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ মে ২১, ২০২৬, ৪:৫৫ পি.এম
নীলফামারীর ডিমলা সরকারি খাদ্য গুদামে ধান ছাঁটাইয়ের নামে নিম্নমানের চাল সংগ্রহ, ডিলারদের কাছ থেকে নানা অজুহাতে ঘুষ আদায় এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ ও ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) নবাবের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ধান ছাঁটাইয়ের নামে নিম্নমানের চাল সরকারি গুদামে জমা দেখিয়ে সরকারের প্রায় ১ কোটি ৫৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিলারদের কাছ থেকে মাস্টার রোল, সাংবাদিক, শ্রমিক দিবস, বড় বস্তা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক খাতের নামে নিয়মিত ঘুষ আদায়েরও অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত আমন মৌসুমে সরকার প্রতি মণ ধান ১ হাজার ৩৬০ টাকা দরে মোট ২ হাজার ১১৪ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করে। পরে সেই ধান ছাঁটাইয়ের জন্য বিভিন্ন মিলের সঙ্গে চুক্তি করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ ও ওসিএলএসডি নবাবের যোগসাজশে ব্যবসায়ী জহির ওরফে দরবেশ জহির সালভি অটো রাইস মিলের নামে ১ হাজার ৪৫৪ মেট্রিক টন ধান উত্তোলন করেন। অপরদিকে ব্যবসায়ী ফরিদুল জলঢাকার এস আলী অটো রাইস মিল, মা রেজিয়া হাসকিং মিল ও ভাই-ভাই হাসকিং মিলের নামে আরও ৬৬০ মেট্রিক টন ধান উত্তোলন করেন।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি টন ধান থেকে ৬৮০ কেজি চাল সরকারি গুদামে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃতপক্ষে ধান ছাঁটাই না করে বিভিন্ন এলাকা থেকে কমদামের নিম্নমানের চাল ও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের (ডিও) চাল সংগ্রহ করে তা ছাঁটাইয়ের চাল হিসেবে গুদামে সমন্বয় দেখানো হয়।
এভাবে প্রতি টনে প্রায় ৩ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী। অনুসন্ধানে দাবি করা হয়, এতে দুই কর্মকর্তা প্রায় ২৮ লাখ টাকা ঘুষ আদায় করেন।
অভিযোগ রয়েছে, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ডিলারদের জন্য বরাদ্দ চাল সরকারি গুদাম থেকে সরবরাহ না করে ব্যবসায়ী ফরিদুল ইসলামের ব্যক্তিগত গুদাম থেকে নিম্নমানের চাল বিতরণ করা হয়েছে। পরে সেই চাল সরকারি গুদামে সমন্বয় দেখিয়ে মিল মালিকদের নামে বিল উত্তোলন করা হয়।
গত ২২ এপ্রিল মা রেজিয়া ও ভাই-ভাই হাসকিং মিলের নামে ৩৪ হাজার ৫০০ টাকা করে বিল ছাড় হয় বলেও জানা গেছে।
একাধিক খাদ্যবান্ধব ডিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চাল উত্তোলনের সময় বিভিন্ন খাতের নামে তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়।
ডিলারদের অভিযোগ অনুযায়ী— মাস্টার রোল বাবদ ১ হাজার ২০০ টাকা, সাংবাদিকদের নামে ৩০০ টাকা, মে দিবস উপলক্ষে ৫০০ টাকা এবং বড় বস্তা সরবরাহের জন্য ৫ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে।
এছাড়া ওএমএস ও টিসিবির চাল সরবরাহকারী ডিলারদের কাছ থেকেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য গুদামের সিসি ক্যামেরা অকেজো রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ডিলারদের চাল কম দিয়ে অতিরিক্ত মজুত তৈরি করে সেই চাল ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রির অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের এক খাদ্যবান্ধব ডিলারের চাল কম দেওয়ার অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে ওই ডিলারকে বিভিন্ন খাতে টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করতে দেখা যায়।
সরেজমিনে সদর উপজেলার ভাই-ভাই হাসকিং মিলে গিয়ে দেখা যায়, মিলটির ভেতরে ইলেকট্রনিক্স পণ্য মজুত রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, মিলটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। তবে মিল মালিক রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি অন্য মিল থেকে চাল ছাঁটাই করে সরবরাহ করেছেন।
মা রেজিয়া হাসকিং মিলের মালিক রেজাউল করিমও বিল উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
ব্যবসায়ী জহির বলেন, “মাস্টার রোল, সাংবাদিক ও মে দিবসের জন্য আমি টাকা নিয়েছি। তবে ওসিএলএসডির টাকা আমি নিইনি।”
খাদ্য গুদাম শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মফিজুল ইসলাম বলেন, “মে দিবসের নামে টাকা নেওয়া হলেও শ্রমিকেরা কোনো টাকা পাননি।”
ওসিএলএসডি নবাব তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি কোনো ঘুষ বাণিজ্য করি না।”
খাদ্য নিয়ন্ত্রক মামুনুর রশিদ প্রথমে বিষয়টি এড়িয়ে যান। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সৈয়দ আতিকুল হকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরানুজ্জামান বলেন, “অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানতে হবে। যদি অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি তদন্তের অনুরোধ জানানো হবে।”