
“৮০ শতাংশ শরীর পুড়ে গেছে, চিকিৎসা ও খাবারের অভাবে কাটছে মানবেতর জীবন; সমাজের বিত্তবানদের কাছে সাহায্যের আবেদন”
একদিন যে চোখে ছিল স্বপ্নের আলো, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর প্রত্যয় নিয়ে যে নারী পাড়ি জমিয়েছিলেন হাজার মাইল দূরের প্রবাসে, আজ সেই চোখ বেয়ে ঝরছে অসহায়ত্বের অশ্রু। যে হাত একসময় কঠোর পরিশ্রম করে স্বামী-সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিয়েছে, সেই হাতই আজ সাহায্যের আশায় প্রসারিত। একসময় পরিবারের ভরসা ছিলেন তিনি, অথচ আজ নিজের বেঁচে থাকার জন্যই অন্যের দ্বারে দ্বারে সহায়তা চাইতে হচ্ছে। জীবন যেন এক নির্মম পরিহাসের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর কাছে।
বলছি নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার গুলমুন্ডা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের হাসেম আলীর স্ত্রী তহমিনা বেগমের কথা। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিণতিতে সেই প্রবাসজীবনই কেড়ে নিয়েছে তাঁর স্বাভাবিক জীবন, সৌন্দর্য ও কর্মক্ষমতা। এখন সামান্য চিকিৎসা আর দুমুঠো খাবারের জন্য মানুষের সহযোগিতা কামনা করছেন তিনি।
পরিবারের স্বচ্ছলতার আশায় ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় যান তহমিনা। সেখানে একটি পুলিশ কর্মকর্তার বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ নেন। মাসিক বেতন ছিল ৩০ হাজার টাকা। সেই উপার্জন থেকেই দেশে থাকা স্বামী ও চার সন্তানের ভরণপোষণের জন্য নিয়মিত টাকা পাঠাতেন। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে আপনজনদের ভালো রাখাই ছিল তাঁর একমাত্র স্বপ্ন।
কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে ঘটে যায় জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সকালে রান্না করার সময় গ্যাসের চুলার সুইচ চালু করতে গিয়ে সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তেই আগুনে ঝলসে যায় তহমিনার শরীর। ভয়াবহ অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় তাঁকে প্রথমে শারজার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দীর্ঘ আড়াই মাস নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর জ্ঞান ফেরে তাঁর। কিন্তু ততদিনে শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে। হারিয়েছেন মাথার চুল, শরীরের স্বাভাবিক ত্বক ও চেহারার আগের অবয়ব। আয়নার সামনে দাঁড়ালে নিজের চেহারা দেখে নিজেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। যে জীবন নিয়ে একদিন স্বপ্ন দেখতেন, সেই জীবনই আজ তাঁর কাছে এক দীর্ঘ যন্ত্রণার নাম।
তহমিনার অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর বাড়ির মালিক পুলিশ কর্মকর্তা আলী হোসেন তাঁকে প্রায় তিন মাস নিজের বাড়িতে রেখেছিলেন। দেশে ফেরত পাঠানোর সময় ভবিষ্যতে চিকিৎসার সব ব্যয় বহন এবং এক বছরের বেতন পাঠানোর আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু দেশে ফেরার পর মাত্র এক মাসের বেতন পাঠিয়ে যোগাযোগের সব মাধ্যম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে আর কোনো খোঁজখবর কিংবা সহযোগিতা পাননি তিনি।
দেশে ফিরে যেন আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন তহমিনা। যাদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছিলেন, সেই স্বামী-সন্তানদের কাছ থেকেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ তাঁর। তাঁর ভাষ্য, এখন ঠিকমতো খাবার জোটে না, চিকিৎসাও করাতে পারছেন না। শরীরজুড়ে চুলকানি ও নানা ধরনের যন্ত্রণা বাড়ছে। আগের মতো শারীরিক শক্তি নেই, কাজ করার সামর্থ্যও হারিয়েছেন। কাজ করতে চাইলেও বিকৃত চেহারার কারণে কেউ তাঁকে কাজে নিতে চায় না।
একদিকে চিকিৎসার অভাব, অন্যদিকে অনাহার ও অসহায়ত্ব, সব মিলিয়ে প্রতিটি দিন তাঁর কাছে হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রাম। তবুও বাঁচতে চান তহমিনা। আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। চান, অন্তত প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটুকু যেন পান। তাঁর এই আকুতি কোনো বিলাসী জীবনের স্বপ্ন নয়, কেবল একটু বেঁচে থাকার অধিকার।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তহমিনা বলেন, “আমি সৌদি আরবে ছিলাম দুই বছর, আর দুবাইয়ে ছিলাম প্রায় পাঁচ বছর। প্রবাসে থাকার সময় দেশের উন্নয়নে সামান্য হলেও ভূমিকা রেখেছি। দেশি-বিদেশি অনেক মানুষকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছি। আজ আমি নিজেই বিপদে পড়ে গেছি। আপনারা আমাকে সাহায্য করুন। আমাকে বাঁচান। আমি চিকিৎসা নিয়ে আবার বাঁচতে চাই।”
তহমিনার চিকিৎসা ও জীবনধারণের জন্য আর্থিক সহযোগিতা চেয়েছেন তাঁর স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরাও। সমাজের বিত্তবান, প্রবাসী বাংলাদেশি, মানবিক সংগঠন এবং সহৃদয় মানুষের কাছে তাঁর আবেদন, সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ান। আপনাদের সামান্য সহযোগিতাও হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে একজন বিপর্যস্ত নারীর বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
তহমিনার জন্য আর্থিক সহায়তা পাঠানোর বিকাশ ও নগদ নম্বর: ০১৩০৬১২১৯১৪।
একসময় পরিবারের স্বপ্ন বাঁচাতে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন যে নারী, আজ তাঁর নিজের জীবন বাঁচানোর স্বপ্নটুকু পূরণ করতে প্রয়োজন সবার সম্মিলিত মানবিক সহযোগিতা। আমাদের সামান্য সহমর্মিতা ও সহযোগিতাই হতে পারে তাঁর নতুন করে বেঁচে থাকার অবলম্বন।
রাশেদুজ্জামান সুমন, নির্বাহী সম্পাদক, 








