ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপি তাদের ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে এককভাবে সরকার গঠনের পর এখন সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি এলাকায় এই কার্ড বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্বল্পআয় ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার টাকা করে সরাসরি নগদ সহায়তা দেওয়া হবে। এতে এক অর্থবছরে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হচ্ছে প্রায় ১২ হাজার ৭২ কোটি টাকা, যেখানে ক্যাশ-আউট চার্জও অন্তর্ভুক্ত। তবে বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বয় করলে উল্লেখযোগ্য অঙ্ক সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
রোববার অর্থ মন্ত্রণালয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এক বৈঠকে কর্মসূচির বাস্তবায়ন কৌশল, সম্ভাব্য ব্যয় ও সমন্বয় প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
কারা অগ্রাধিকার পাবেন
প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্রধারী হতে হবে এবং স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা ইউনিয়ন পরিষদের সুপারিশ থাকতে হবে।
অগ্রাধিকার পাবেন—
গ্রামীণ দরিদ্র ও ভূমিহীন পরিবার, কৃষিশ্রমিক ও দিনমজুর, উপার্জনে অক্ষম সদস্যবিশিষ্ট পরিবার, নারীপ্রধান পরিবার, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা বা স্বামী পরিত্যক্তা নারী, ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী অবিবাহিত মেয়ের পরিবার, প্রত্যাগত অভিবাসী বিশেষত নারী অভিবাসীর পরিবার, প্রতিবন্ধী বা অটিজম আক্রান্ত সদস্য থাকা পরিবার।
যেসব পরিবারের ঘর কাঁচা বা অস্থায়ী উপকরণে নির্মিত এবং কৃষিজমি নেই কিন্তু কৃষিনির্ভর—তাদেরও অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হচ্ছে। সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ বসতভিটা থাকলেও কৃষিযোগ্য জমি না থাকলে সেই পরিবার ভূমিহীন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বর্তমানে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)–এর কার্ডধারী প্রায় ৬৫ লাখ পরিবার ভর্তুকিমূল্যে পণ্য পাচ্ছে। এছাড়া খাদ্য মন্ত্রণালয় পরিচালিত খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়র ভালনারেবল ওম্যান ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচির উপকারভোগীদের তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তির চিন্তাভাবনা চলছে।
কারা পাবেন না
একই পরিবারের একাধিক সদস্য এই সুবিধা নিতে পারবেন না। যেসব পরিবার ইতোমধ্যে অন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধা পাচ্ছেন এবং সমন্বয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন না, তারা নতুন কার্ড পাবেন না।
সিঙ্গেল রেজিস্ট্রি সিস্টেমে তথ্য যাচাই করে যদি দ্বৈততা ধরা পড়ে, সেসব আবেদনও বাতিল হতে পারে।
কীভাবে দেওয়া হবে সহায়তা
এই কর্মসূচিতে সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে সরকার থেকে সরাসরি উপকারভোগীর কাছে অর্থ পাঠানো হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমে এবং স্বচ্ছতা বজায় থাকে। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে এনআইডি, জন্মতারিখ, মোবাইল নম্বর ও ইউনিয়নের নাম ব্যবহার করে তথ্য অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব রয়েছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, টিআইএন, সরকারি কর্মচারী ও পেনশনার ডাটাবেজসহ বিভিন্ন তথ্যভান্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হবে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে গভর্নমেন্ট-টু-পাবলিক পদ্ধতিতে সরাসরি অর্থ পাঠানো এবং রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাও রাখা হবে।
অর্থের সংস্থান
বিদ্যমান বিভিন্ন ভাতা কর্মসূচির উপকারভোগীদের সমন্বয়ের মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের হিসাব করা হয়েছে। সে ক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ সমন্বিত তহবিল থেকে মেটানো সম্ভব হতে পারে, আর অবশিষ্ট অর্থ সরকারকে আলাদাভাবে বরাদ্দ দিতে হবে।
দ্রুত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা
প্রাথমিকভাবে আটটি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প চালুর প্রস্তাব রয়েছে। মাঠপর্যায়ে দ্রুত যাচাই-বাছাই, নীতিমালা অনুমোদন ও পে-রোল প্রস্তুতের মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই ভাতা বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বিদ্যমান এনআইডি-সংযুক্ত ডাটাবেজ ব্যবহার করা গেলে ঈদের আগেই পরীক্ষামূলক বিতরণ শুরু করা সম্ভব।
চূড়ান্ত নীতিমালা ও বাস্তবায়ন কাঠামো অনুমোদনের পরই কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ রূপ জানা যাবে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, স্বচ্ছতা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।