
মোসাদ্দেকুর রহমান সাজু, স্টাফ রিপোর্টার, ডোমার নীলফামারীঃ মানুষ সারাজীবন বেঁচে থাকে তার কর্মের উপর, তেমনি মৃত্যুর একযুগ পেরিয়ে গেলেও এলাকাবাসীর হৃদয়ে অমর হয়ে এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার ১নং ভোগডাবুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সফল চেয়ারম্যান ছকিকুল আলম খোকন।
ব্যক্তি জীবনে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তার উপর অর্পিত দ্বায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে গেছেন। এলাকার যুবক থেকে শুরু করে আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলের কাছে তিনি প্রিয় খোকন চেয়ারম্যান নামে পরিচিত ছিলেন।
সময়ের ব্যবধানে আজ তিনি আমাদের মাঝ থেকে হারিয়ে গেলেও তার ব্যক্তিত্ব, কর্ম এবং স্মৃতি এখনো মানুষের হৃদয়ে অমর হয়ে রয়েছে।তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক পরিচিত দৃশ্য। তিনি সবসময় মিষ্টি রঙের সাফারি পড়তে পছন্দ করতেন।
১নং ভোগডাবুড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের পাশাপাশি তাঁর পরিচিতি ছিল একটি ইউনিয়নের সীমানার অনেক বাইরে। নেতৃত্ব, সাহস, বিচক্ষণতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃঢ়তায় তিনি ছিলেন ডোমার উপজেলার অন্যতম প্রভাবশালী ও দাপুটে চেয়ারম্যান।
মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো, ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজের অবস্থানে অটল থাকার জন্য তিনি ছিলেন সকলের প্রিয়ভাজন এবং সুপরিচিত। সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর অগাধ বিচরণ। শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন, জনকল্যাণ, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, অবকাঠামো উন্নয়ন কিংবা মানুষের সুখ-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, সর্বক্ষেত্রেই ছিল তাঁর আন্তরিক উপস্থিতি। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার বিরল গুণ তাঁকে মানুষের কাছে প্রিয় এবং আপন হতে সাহায্য করেছিল।
তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব এবং সারগাম সাংস্কৃতিক পরিষদের উপদেষ্টা। যদিও সাংস্কৃতিক কিংবা ক্রীড়া কর্মকাণ্ডে তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না, তবুও এই দুটি ক্ষেত্রের বিকাশে তিনি সবসময় বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তরুণদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহিত করতেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ দিতে কখনো কার্পণ্যতা করতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল, একটি সুস্থ, সচেতন ও মানবিক সমাজ গঠনে সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার ভূমিকা অপরিসীম।
মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু কিছু মানুষের কর্ম, ব্যক্তিত্ব এবং মানুষের হৃদয়ে গড়ে তোলা ভালোবাসা কখনো মুছে যায় না। মরহুম ছকিকুল আলম খোকন ছিলেন তেমনই একজন, যিনি তাঁর কর্ম, নেতৃত্ব, ব্যক্তিত্ব ও মানবিকতার জন্য মানুষের স্মৃতিতে আজও অমলিন।
মরহুম ছকিকুল আলম খোকনের ব্যক্তিগত পরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি। ১৯৪৭ সালের ৩০শে জুন এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন তাঁহার পিতা মরহুম মোজাম্মেল হক তিনিও ১নং ভোগডাবুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন, এবং মাতার মরহুম আমেনা খাতুন। পারিবারিক মূল্যবোধ আর নৈতিকতার শিক্ষাই তাঁকে পরবর্তীতে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিল। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তিন সন্তানের জনক তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।
তাঁর শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল নীলফামারী সরকারি কলেজ। সেখান থেকেই তিনি সফলভাবে স্নাতক (Graduation) সম্পন্ন করেন। তৎকালীন সময়ে নীলফামারী সরকারি কলেজের হোস্টেলে থেকে তাঁর পড়াশোনা এবং জ্ঞানচর্চার প্রতি একাগ্রতা আজও অনেকের কাছে অনুপ্রেরণা।
তার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল চট্টগ্রাম রেলওয়েতে চাকুরির মাধ্যমে। কিন্তু চার দেয়ালের বন্দি জীবন আর গতানুগতিক চাকরি তাঁকে খুব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। সাধারণ মানুষের জন্য কিছু করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে তিনি সেই সুনিশ্চিত ক্যারিয়ার ত্যাগ করে রাজনীতিতে যোগ দেন। দেশ ও মানুষের সেবা করার জন্য বড় ত্যাগের প্রয়োজন হয় মরহুম ছকিকুল আলম তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসার মাধ্যমে তিনি সাহসিকতারই পরিচয় দিয়েছিলেন।
জনগণের অকৃত্রিম ভালোবাসায় তিনি ভোগডাবুড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে পরপর দুইবার নির্বাচিত হন। তাঁর মেয়াদকালিন সময় ছিল ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ এবং ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত। তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে উন্নয়নে এক নতুন ধারা সূচনা করেছিলেন। সে সময়ে তিনি শুধু একজন জনপ্রতিনিধিই ছিলেন না, ছিলেন জনগণের অভিভাবক, বিপদের আশ্রয়স্থল, আর উন্নয়নের এক নির্ভরযোগ্য পথ প্রদর্শক।

মরহুম ছকিকুল আলম খোকনের ব্যক্তিত্ব, ভাষাগত দক্ষতা ছিল প্রখর, তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত সাবলীলভাবে তিনি ইংরেজি ভাষায় কথা বলতেন।, যা তাঁর উচ্চ শিক্ষা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল সততা এবং সাহস। যে কোনো চ্যালেঞ্জিং কাজে তিনি অকুতোভয় ছিলেন এবং সততার প্রশ্নে কখনোই কারও সঙ্গে আপোস করেননি।
সুদীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে ২০১২ইং সালের ১৭ই অক্টোবর তিনি সকলকে কাঁদিয়ে বিধাতার ডাকে সাড়া দিয়ে পরলোক গমন করেন। তাঁর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া পড়েছিল। এলাকাবাসী চিরদিনের জন্য হারিয়েছে একজন সৎ নির্ভিক ও জনদরদী অভিভাবককে। আর সমাজ হারিয়েছে এক নিবেদিত সেবককে।
মোসাদ্দেকুর রহমান সাজু,স্টাফ রিপোর্টার, ডোমার নীলফামারী 


















