
মোসাদ্দেকুর রহমান সাজু, স্টাফ রিপোর্টার,ডোমার নীলফামারীঃ ১শত ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চিলাহাটি দৃষ্টিনন্দন রেলওয়ে স্টেশন এখন অব্যবহৃত এবং অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ডোমার উপজেলার সীমান্তঘেরা একটি ইউনিয়নের মধ্যে বিশাল এই দৃষ্টিনন্দন ভবনটি দুর থেকে দেখলে সকলের নজর কারে। কিন্তু বর্তমানে ভবনটির ভিতরের আসবাবপত্রগুলো অব্যবস্থাপনা অবস্থায় ধুলোবালিতে জরাজীর্ণ নোংরা হয়ে পড়ে রয়েছে। স্টেশনের ভবন সংলগ্ন রেস্টহাউজটি ও কোন কাজে আসছেনা।
অন্তবর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই রেল যোগাযোগ ও চিলাহাটি স্থলবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করার পর থেকে এসব স্থাপনা এখন অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। স্টেশনটির কাছে গিয়ে দেখা গেছে পরিত্যক্ত নিচতলার বারান্দায় সারি সারি ফ্যান ঝুলানো রয়েছে, কতদিন ধরে যে ঘোরেনা এসব ফ্যান বলাই মুশকিল। জানালা দিয়ে দেখা যায়, ঘরের মধ্যে প্যাকেটবন্দী চেয়ার-টেবিল আর স্টিলের টুলের সারি ধুলোয় বিবর্ণ। ভবনটির দ্বিতীয় তলায় ব্যাংক ও শুল্ক কর্মকর্তাদের ঘরগুলো খালি পড়ে রয়েছে। তৃতীয় তলায় রেস্তোরাঁর জায়গাটি ও ফাঁকা পরে রয়েছে, স্টেশন ভবনের পাশে দোতলা ভিআইপি অতিথি ভবনটিও তালাবদ্ধ। ওভারব্রিজ, যাত্রীছাউনি ও গার্ডরুম সীমান্ত পর্যন্ত টানা রেললাইন গুলোতে এখন মরিচা পড়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কয়েক বছরে প্রায় ১শত ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার ১নং ভোগডাবুড়ী ইউনিয়নের চিলাহাটিতে দৃষ্টিনন্দন আইকনিক রেল স্টেশন এবং স্থলবন্দরের স্থাপনা। দীর্ঘ প্রায় ৫৫ বছর পর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে পূর্ণরায় “ঢাকা– কোলকাতা–ঢাকা ” রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। তারপর থেকে চিলাহাটি স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের সঙ্গে রেলপথে প্রথমদিকে পণ্যবাহী ট্রেন এবং কিছুদিন পর যাত্রীবাহী ট্রেন “মিতালী এক্সপ্রেস” চলাচলও শুরু হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালে এসে তা থমকে যায়। এরপর ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে অবকাঠামো না থাকার কারণ দেখিয়ে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই স্থলবন্দরটি বন্ধ ঘোষণা করেন। বর্তমানে এখানকার ভবন, রেলপথ কাস্টমস অফিস সবই অচল অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এর পাশাপাশি থমকে গেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের আশার আলো ও উদ্যোগ। তবে উত্তরবঙ্গের মানুষের কথা চিন্তা করে এই স্থলবন্দরটি পূর্ণরায় চালু করা প্রয়োজন বলে অনেকেই মনে করছেন।
বিগত ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার চিলাহাটিকে স্থলবন্দর ঘোষণা করেছিলেন। তবে এর কাজ চালু হতে প্রায় এক দশক সময় লেগে যায়। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য চিলাহাটি স্টেশন থেকে সীমান্ত পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের কাজ প্রথম শুরু হয় ২০১৯ সালে, এরপর দুই দেশের প্রাথমিক কাজ শেষ হলে ২০২১ সালের ১লা আগস্ট পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়। এবং তারপরের বছর ২০২২ সালে চালু হয়েছিল যাত্রীবাহী ট্রেন “মিতালি এক্সপ্রেস”।
চিলাহাটি সীমান্তের ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ কোচবিহার জেলার হলদিবাড়ী স্টেশন। চিলাহাটি-হলদিবাড়ী রেলপথের সূচনা হয়েছিল ব্রিটিশ আমলে। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান আমলে পাক-ভারত যুদ্ধের পর এই রেলপথ পথ বন্ধ করা হয়। অর্ধ-শতাব্দীর বেশি সময় পরে এই পথটি খুললেও বর্তমানে আবারও এই পথটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
এবিষয়ে দৃষ্টিনন্দন আইকনিক রেল স্টেশন ও চিলাহাটি বর্ডার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আবদুর রহিম জানান, প্রকল্পটির ব্যয় শুরুতেই ধরা হয়েছিল ৮০ কোটি টাকা। পরে ১শত২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে চিলাহাটি আইকনিক রেলস্টেশন এবং স্থলবন্দর প্রকল্পটির কাজ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুন মাসে। রেলের ওয়াগন, রাস্তা, বিদ্যুৎসহ আনুষাঙ্গিক খাতগুলো ধরলে মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ২শত কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় স্টেশনে রেললাইনের সংখ্যা বাড়ানো, প্ল্যাটফর্ম ও ফুটওভারব্রিজ নির্মাণ, রেল কোচ পরিষ্কার ও মেরামতের জন্য শেডসহ বিভিন্ন স্থাপনাও নির্মাণ করা হয়। বড় বহুমুখী স্টেশন হিসেবে এখানে শুল্ক ও ব্যাংকসেবাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ করা হয়। মিতালি এক্সপ্রেসে আগে ভারত যাওয়ার জন্য কাস্টমস ও ইমিগ্রেশনের কাজ সম্পন্ন করতে হতো ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে। তবে উত্তরাঞ্চলের মানুষের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে চিলাহাটি স্টেশনে ইমিগ্রেশন সেবার জন্যও প্রস্তুুত করা হয়েছিল কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন ভবন। তবে এসব স্থাপনা কাজে লাগানোর আগেই স্থলবন্দরটি মুখ থুবড়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক যাত্রী ও পণ্য পরিবহনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চাঙা হওয়ার যে আশা তৈরি হয়েছিল, সেটিও এখন অনিশ্চিত হয়ে অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে।
চিলাহাটির স্থানীয় ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ এবং আব্দুর রশিদ প্রতিনিধিকে জানান, চিলাহাটি স্টেশন দিয়ে যদি পণ্য আনা-নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, সেক্ষেত্রে যারা আইআরসি (IRC) ইমপোর্ট-এক্সপোর্টধারী রয়েছেন, তাদের জন্য অনেক সুবিধা হবে। পণ্য আনা-নেওয়ার পাশাপাশি চিলাহাটিতে পণ্য খালাস করে এখান থেকে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা যদি সরকার করে, সেক্ষেত্রে এখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া ও তারা বর্তমানে বাংলাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া করেন এতে তাদের যাতায়াত থেকে শুরু করে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়সহ সবকিছুই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। চিলাহাটি স্টেশন দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার পাশাপাশি বাই রোড চালু করার বিষয়ে সরকার যদি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তাহলে চিলাহাটি স্টেশন থেকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা সরকারের রাজস্ব আয় করা সম্ভব বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
এবিষয়ে চিলাহাটি রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার রুহুল আমিন জানান, ২০২১ সাল থেকে মূলত ভারত থেকে পাথর বোঝাই ট্রেন এ দেশে আসত। মাসে অন্তত চার থেকে পাঁচটি মালবাহী ট্রেন এই পথ দিয়ে চলাচল করত। চিলাহাটি স্টেশন দিয়ে যখন পণ্য আনা-নেওয়া শুরু হয়, তখন কয়েক দফায় ভারত থেকে পণ্য এসে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাঠানো হতো। সেই পণ্য থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছিল প্রায় কয়েক কোটি টাকা। কিন্তু ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর চিলাহাটি স্টেশন দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেনটিও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তারপর থেকে আর আয়ের মুখ দেখেনি স্টেশনটি। তিনি আরও বলেন, পূর্ণরায় যদি এই স্টেশন দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া শুরু করার পাশাপাশি যাত্রী ওঠানামা বিষয়ে সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তাহলে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যেমন রাজস্ব আদায় বাড়বে তেমনি যাত্রী ওঠানামার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাত্রী এসে যখন চিলাহাটি স্টেশন থেকে ওঠানামা করবে তখন সেখান থেকেও সরকার ব্যাপক রাজস্ব আয় করতে পারবে। এছাড়াও চিলাহাটি স্টেশন থেকে যাত্রী ওঠানামা করতে যেসব আনুষঙ্গিক অবকাঠামো প্রয়োজন যেমন, ভিআইপি রেস্ট হাউস, ব্যাংক, যাত্রী চেকিং করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি এখানে রয়েছে। তিনি বলেন, এখানে আরএমবি, জিআরপি এবং কাস্টমস কর্মকর্তাদের কার্যক্রম পরিচালনার অফিস থাকার জায়গারও সুব্যবস্থা রয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা যাত্রী ওঠানামা ও পণ্য আনা নেওয়াসহ খালাসের ক্ষেত্রেও আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছি। মূলত সব ধরনের অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধা চিলাহাটি রেলওয়ে
স্টেশনে রয়েছে।
চিলাহাটির স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পণ্য পরিবহন চালু থাকাকালে শ্রমিক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের আনাগোনা ছিল এই স্থলবন্দরকে ঘিরে। সেসময় আশপাশের জমির দামও বেড়ে গিয়েছিল। বন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখে অনেকে বিনিয়োগেরও পরিকল্পনা করেছিলেন।
এবিষয়ে চিলাহাটি প্রেসক্লাবের সভাপতি মাহবুবুল হক ওহাবুল এবং সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল হক কাজল জানায়, বন্দরটি দিয়ে পণ্য আনা নেওয়া শুরু হওয়ার পর থেকে এখানকার পরিবেশটাই চেঞ্জ হয়ে গেছে। অনেক দরিদ্র মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর থেকে সেই মানুষ গুলো কাজকর্ম হারিয়ে বেকারত্বের অভিসাপে ভুকছে।তারা আরও জানায়, স্থলবন্দরটি দ্রুত চালু হলে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি এলাকার মানুষের অনেক উপকার হবে। এছাড়াও বর্তমানে স্টেশনের আয় কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। শত কোটি টাকা খরচ করে অবকাঠামো তৈরির পর স্থলবন্দরটির পাশাপাশি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ লোকসান গুনছেন।
চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানায়, দুই দেশের মধ্যে পণ্য সেবা চালুর পর পাথরের এক একটি চালানে ভাড়া বাবদ রেল কর্তৃপক্ষ ২০ থেকে ২৬ লাখ টাকা পেত। এবং মাস শেষে সেটা দাঁড়াত প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকা। স্টেশনের আয়-ব্যয়ের খাতা বলছে, ২০২৩ সালের জুলাই মাসে স্টেশনের আয় হয়েছিল প্রায় ৮০ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা নেমে আসে ৩৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এছাড়াও স্টেশনটিতে দুজন স্টেশন মাস্টারসহ ৫০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এখন তাঁদের কাজও কমে গেছে। বর্তমানে কেবল অভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী ট্রেনই চলছে।
চিলাহাটির স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মনে করেন, এ বন্দরটির কার্যক্রম পূর্ণরায় চালু হলে ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সুবিধা হতো। বর্তমানে স্থলবন্দরটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন তাঁরা বিপাকে পড়েছেন।

নীলফামারী চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহাবুব-উর রহমান জানায়, চিলাহাটি স্থলবন্দর নিয়ে আমরা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। এটা চালু করার জন্য যেখানে যেখানে কথা বলা দরকার আমরা সেই যোগাযোগ অব্যহত রেখেছি। পাশাপাশি এখানে রেলপথটি যেহেতু আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে সম্পৃক্ত এবং বর্তমানে পার্শ্ববর্তী দেশের সাথে আমাদের সম্পর্ক নাজুক, তারপরও আমরা চিলাহাটি স্থলবন্দর ও রেলপথ চালুর বিষয়ে আমাদের চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যত দ্রুত সম্ভব স্থলবন্দর ও রেলপথ চালুর বিষয়ে আমরা আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি বলে তিনি জানান।
এবিষয়ে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের বরাতে জানাযায় স্থলবন্দরটি আপাতত চালু হচ্ছে না। তবে চালু করতে হলে বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের সম্মতি প্রয়োজন। এ জন্য উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
মোসাদ্দেকুর রহমান সাজু,স্টাফ রিপোর্টার, ডোমার নীলফামারী 


















