
জয়নাল আবেদীন হিরো,স্টাফ রিপোর্টারঃ
বাংলাদেশি’পরিচয়ের স্বীকৃতি,মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ পুনর্বাসন,বিদ্যুৎ সংযোগ অব্যাহত রাখা এবং দেশের ১১৬টি উর্দুভাষী ক্যাম্পে স্থিতাবস্থা বজায় রেখে উচ্ছেদ বন্ধের দাবিতে নীলফামারীর সৈয়দপুরে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সৈয়দপুর জিআরপি মোড়ে বাংলাদেশ উর্দুভাষী অধিকার আন্দোলন,সৈয়দপুর সাংগঠনিক জেলা ও উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়।এতে বিভিন্ন ক্যাম্পের কয়েক শতাধিক বাসিন্দা ও সংগঠনের নেতাকর্মী অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন,স্বাধীনতার পর পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্পে বসবাস করে আসছেন উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর মানুষ।তাদের অনেকেই বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম এ দেশেই বেড়ে উঠেছেন।নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও সামাজিক ও প্রশাসনিক পরিসরে তাদের পরিচয় নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে বলে দাবি করেন বক্তারা। তারা বলেন,উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ের মাধ্যমে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি অবস্থান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।২০০৩ সালের Abid Khan and others v.Government of Bangladesh and others মামলার রায়ে উর্দুভাষী আবেদনকারীদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।পরবর্তীতে ২০০৮ সালের Sadaqat Khan v.Chief Election Commissioner মামলাতেও ক্যাম্পে বসবাসকারী উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের অধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসে।বক্তাদের দাবি,জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেও রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে এখনও তাদের নানা ধরনের পরিচয়ে অভিহিত করা হয়।এ অবস্থার অবসানে সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ পরিচয়ের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান তারা।
মানববন্ধন থেকে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়।দাবিগুলো হলো-১.সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে দেশের ক্যাম্পবাসী উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীকে অবিলম্বে‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে।২.পূর্বঘোষিত সাত দফা দাবির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ পুনর্বাসন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করতে হবে।৩.পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পবাসীর বিদ্যুৎ সংযোগ অব্যাহত রাখতে হবে।পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে বকেয়া বিল পরিশোধের ব্যবস্থা এবং সংযোগ বিচ্ছিন্নের নামে হয়রানি বন্ধ করতে হবে।৪.মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত দেশের ১১৬টি ক্যাম্পে স্থিতাবস্থা বজায় রেখে সব ধরনের উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ রাখতে হবে।পরিচয়ের সংকট নয়,নাগরিক মর্যাদা চাই’মানববন্ধনে বাংলাদেশ উর্দুভাষী অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক মো. আবু রায়হান বলেন,আমরা কোনো দেশের আটকে পড়া নাগরিক নই।আমরা বাংলাদেশের নাগরিক।আমাদের ভোটার তালিকায় নাম আছে,জাতীয় পরিচয়পত্র আছে।তাই‘আটকে পড়া’ বা‘বিহারি’পরিচয়ের পরিবর্তে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’ পরিচয়ের স্বীকৃতি চাই।তিনি বলেন,ক্যাম্পবাসীর পুনর্বাসন হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ,নিরাপদ ও টেকসই।পুনর্বাসনের আগে ক্যাম্প উচ্ছেদ কিংবা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের মতো কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজেদ ইকবাল বলেন,আমরা সরকারের কাছে করুণা চাই না,চাই নাগরিক অধিকার ও মর্যাদা। বছরের পর বছর ধরে ক্যাম্পে বসবাসকারী মানুষের জন্য টেকসই আবাসন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।পুনর্বাসন না হওয়া পর্যন্ত ১১৬টি ক্যাম্পে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে।তিনি আরও বলেন,ক্যাম্পের শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রজন্ম বাংলাদেশেই জন্ম নিয়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ যেন পরিচয়ের সংকটে আটকে না থাকে,সে জন্য দ্রুত রাষ্ট্রীয়ভাবে‘উর্দুভাষী বাংলাদেশি’পরিচয়ের স্বীকৃতি প্রয়োজন।ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফ বলেন,বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন কিংবা উচ্ছেদের আতঙ্কে ক্যাম্পবাসী যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকে।মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ অব্যাহত রাখা এবং উচ্ছেদ বন্ধ রাখার দাবি জানাচ্ছি।তিনি ক্যাম্পবাসীর জীবনমান উন্নয়ন,শিক্ষা,স্বাস্থ্য,কর্মসং স্থান ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানান।কর্মসূচিতে স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ উর্দুভাষী অধিকার আন্দোলনের সৈয়দপুর সাংগঠনিক শাখার মো.নাসিব।এ ছাড়া বক্তব্য দেন আন্দোলনের আহ্বায়ক মো.আবু রায়হান,ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সহসভাপতি সানজিদা খাতুন,মো.গোলাম,হামিদা মাতুন,মোস্তফা ক্যাম্পের সভাপতি মো.ওয়াকিল,ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সদস্য মো.লালু এবং সিনিয়র সহসভাপতি নূর হাসান মোলায়েমসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।এ সময় ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজেদ ইকবাল,সাধারণ সম্পাদক আব্দুল লতিফসহ বিভিন্ন ক্যাম্পের কয়েক শতাধিক বাসিন্দা ও সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। মানববন্ধন থেকে সাংবাদিকদের মাধ্যমে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপিত দাবিগুলো দ্রুত বিবেচনার আহ্বান জানান বক্তারা।
জয়নাল আবেদীন হিরো, স্টাফ রির্পোটার 


















