
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার হাজারীহাট পোস্ট অফিসকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ। এক নারীর দাবি— তাকে তালাকের কোনো নোটিশ না দিয়েই ডাক বিভাগের রেজিস্ট্রি খাতায় “প্রাপক পত্র গ্রহণ করেন নাই” উল্লেখ করা হয়েছে। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী মোছা. মমতা বেগম অভিযোগ করেছেন, তার স্বামী ও পোস্ট অফিসের এক কর্মকর্তার যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে তালাক কার্যকর দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি রংপুর বিভাগীয় ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেলের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়, নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে পাঠানো তালাকের নোটিশ ঢাকায় ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। অথচ হাজারীহাট পোস্ট অফিসের রেজিস্ট্রি খাতায় সেটি ৩০ সেপ্টেম্বর গ্রহণ দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ ঢাকায় কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগেই সৈয়দপুরে নোটিশ পৌঁছে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে সরকারি রেজিস্ট্রিতে।
এখানেই শেষ নয়। ১ অক্টোবর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্গাপূজার সরকারি ছুটি চলমান থাকলেও ডাক আদান-প্রদানের সময়সূচি ও রেজিস্ট্রি কার্যক্রম নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন প্রশ্ন।
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন
“একটি নোটিশ কীভাবে কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগেই পোস্ট অফিসে পৌঁছে যায়?”
“চিঠি পাইনি, অথচ খাতায় লেখা গ্রহণ করিনি”
মমতা বেগম বলেন,
“আমাকে কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। পোস্ট অফিস থেকে কেউ বাড়িতেও যায়নি। অথচ খাতায় লেখা হয়েছে আমি নাকি চিঠি গ্রহণ করিনি।”
তিনি জানান, ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি তারাগঞ্জ উপজেলার ভীমপুর ইউনিয়নের শাইলবাড়ী ডাঙ্গাপাড়ায় শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছেও ডাকপিয়ন বা পোস্ট অফিসের কেউ যাননি।
এদিকে পোস্ট অফিসের রেজিস্ট্রি খাতায় “প্রাপক পত্র গ্রহণ করেন নাই” উল্লেখ থাকলেও, সেই সংক্রান্ত কোনো সাক্ষী, স্বাক্ষর বা নোটিশ গ্রহণে অস্বীকৃতির লিখিত প্রমাণ দেখাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ— এমন অভিযোগও উঠেছে।
অসম্পূর্ণ ঠিকানায় কীভাবে পৌঁছালো নোটিশ?
ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, পোস্টমাস্টার তাকে যে রেজিস্ট্রি রশিদ দেখিয়েছেন সেখানে কেবল “মমতা বেগম, সৈয়দপুর, নীলফামারী” লেখা ছিল। পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা, গ্রামের নাম কিংবা পিতার নাম উল্লেখ ছিল না।
প্রশ্ন উঠেছে—
এত অসম্পূর্ণ ঠিকানার চিঠি কীভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে রেজিস্ট্রি খাতায় অন্তর্ভুক্ত হলো?
আর যদি ঠিকানাই অস্পষ্ট হয়, তাহলে “প্রাপক গ্রহণ করেননি” মন্তব্যের ভিত্তি কী?
“আইনের মাধ্যমে আসতে হবে”
মমতা বেগম ও তার ভাই পোস্ট অফিসে গেলে প্রথমে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয় বলে অভিযোগ। পরে পোস্টমাস্টার জানান, চিঠি ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে কোথায় পাঠানো হয়েছে বা কবে পাঠানো হয়েছে— সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
এমনকি নোটিশ দেখতে চাইলে “আইনের মাধ্যমে আসতে হবে” বলেও জানানো হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।
নোটারি পাবলিকে তালাক বৈধ?
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে। তারা জানান, শুধুমাত্র নোটারি পাবলিকের কাগজে তালাক সম্পন্ন হয় না। মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়া জরুরি।
একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন,
“অনেক সময় মানুষ আইনের সঠিক প্রক্রিয়া না জেনে নোটারি পাবলিকের কাগজকে চূড়ান্ত মনে করেন। কিন্তু তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য আইনগত ধাপ রয়েছে। এখানে যদি জালিয়াতি বা তথ্য গোপনের প্রমাণ মেলে, তাহলে এটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।”
অভিযুক্ত হাজারীহাট পোস্টমাস্টার মো. ফজলুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে সৈয়দপুর উপজেলা পোস্টমাস্টার আমিনুর রহমান বলেন,
“ভুক্তভোগী আমাদের কাছে এসেছিলেন। আমরা তাকে বিভাগীয় দপ্তরে অভিযোগ দিতে বলেছি। অভিযোগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা তৈরি করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ডাক বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকারি রেজিস্ট্রি ব্যবস্থাকে ব্যবহার করছেন কিনা, সেটিও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
সুশাসনকর্মীদের মতে, বিষয়টি শুধু একটি পারিবারিক বিরোধ নয়; বরং সরকারি নথি, ডাক বিভাগের স্বচ্ছতা এবং নাগরিক অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনা। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।