রংপুর ০৫:২৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
News Title :
নীলফামারী সদরের প্রতিটি ইউনিয়নে অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধ কমিটি জলঢাকায় আওয়ামীলীগ কর্মীর মিথ্যা অভিযোগের প্রতিবাদে মানববন্ধন  সৈয়দপুর পৌরসভার ৯২ কোটি ৭৬ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা জোরদারে নীলফামারীতে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভা ডোমারে ইয়াবাসহ যুবক আটক, মোটরসাইকেল জব্দ ২১ বছর পর আবারও একসঙ্গে স্কুলজীবনের বন্ধুরা নীলফামারীতে ৬ নভেম্বর এসএসসি ২০০৫ ব্যাচের মিলনমেলা নাশকতার মামলায় সৈয়দপুর সেচ্ছাসেবকলীগ নেতা বাদল গ্রেফতার জলঢাকায় ৬ বছরের শিশুর মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা, থানায় দুই পরিবারের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ নীলফামারীতে দক্ষতা উন্নয়ন ও নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ক সেমিনার জলঢাকায় এডহক কমিটির সভাপতি মামুনকে সংবর্ধনা দিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষ

মাদকের ভয়াল থাবা ও আমাদের বিষণ্ন ভবিষ্যৎ

মাদক আজ আর কেবল ব্যক্তি বা পরিবারের সমস্যা নয়, এটি একটি বিশ্বব্যাপী মরণব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এই বিষাক্ত ছোবল। উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল, কোনো দেশই আজ এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। অবৈধ পাচার, অপরাধ বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে মাদক এক সর্বনাশা ভূমিকা পালন করে চলেছে। অথচ এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় যে স্তরের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সামাজিক সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার চরম অভাব দেখা যাচ্ছে।
Advertisement
Advertisement

​আমাদের দেশের চিত্রটি আরও আশঙ্কাজনক। পুলিশ প্রশাসনের তথ্যমতে, দেশের সংঘটিত ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের মতো অধিকাংশ অপরাধের পেছনেই রয়েছে মাদকাসক্তির পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ যোগসূত্র। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ নিজে মাদক উৎপাদক দেশ না হয়েও অবস্থানগত কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপ্রবণ। দক্ষিণ-পূর্বে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসকে নিয়ে গঠিত ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ এবং উত্তর-পশ্চিমে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরানকে নিয়ে গঠিত ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ এর মাঝামাঝি ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে বাংলাদেশের অবস্থান। এই অঞ্চলের সীমান্তজুড়ে থাকা মাদক চক্রগুলোর তৎপরতা বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সীমান্ত সুরক্ষায় যে দৃঢ়তা ও সতর্কতা থাকা উচিত ছিল, বাস্তবে সেখানে আমরা বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি।

​মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জাতীয় গবেষণার চিত্র আমাদের শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সেই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। এর বড় একটি অংশই উঠতি বয়সের তরুণ এবং তাদের সিংহভাগই ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই এই অন্ধকার জগতে পা বাড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত যুবসমাজের চরম অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। মাদক আজ আর শহরের নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি মফস্বল ও গ্রামপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দিচ্ছে।

Advertisement

​গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে ব্যবহারকারী হিসেবে গাঁজার অবস্থান শীর্ষে। এর পরপরই রয়েছে ইয়াবা, হিরোইন, ফেনসিডিল এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে নেওয়া মাদকের দাপট। একসময়ের বহুল আলোচিত ফেনসিডিলের জায়গা দখল করে নিয়েছে নিত্যনতুন সিন্থেটিক ও ভয়াবহ সব মাদক। বিশেষ করে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক ডেঞ্জার সিগন্যাল। সীমান্তে মাদকের সহজলভ্যতা, ভুল সঙ্গ, কৌতূহল এবং পারিবারিক অশান্তির জেরে আমাদের কিশোর ও তরুণরা লক্ষ্যচ্যুত হয়ে এই মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে।

​অধিকাংশ মাদকাসক্ত ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদের দেশে তাদের উপযুক্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রতুল। চিকিৎসা ও সামাজিক পুনর্বাসনের সুযোগ না থাকায় সুস্থ হয়ে ওঠার পরও অনেকে আবার পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাচ্ছে।

​মাদক সংকটকে কেবল আইন-শৃঙ্খলা বা অপরাধের চশমায় না দেখে একে একটি ‘জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট’ হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।

 

​কেবল পুলিশি অভিযান বা কঠোর আইন প্রয়োগ করে এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। পরিবারকে সন্তানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে। তরুণ সমাজকে যদি এখনই এই ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা না যায়, তবে জাতির ভবিষ্যৎ এক গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। দেশ ও সমাজকে রক্ষা করতে মাদকবিরোধী এই লড়াইকে একটি জরুরি জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে।

Advertisement

নীলফামারী সদরের প্রতিটি ইউনিয়নে অবৈধ বালু উত্তোলন প্রতিরোধ কমিটি

মাদকের ভয়াল থাবা ও আমাদের বিষণ্ন ভবিষ্যৎ

Update Time : ১০:১৮:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

মাদক আজ আর কেবল ব্যক্তি বা পরিবারের সমস্যা নয়, এটি একটি বিশ্বব্যাপী মরণব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনীতিকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে এই বিষাক্ত ছোবল। উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল, কোনো দেশই আজ এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। অবৈধ পাচার, অপরাধ বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরে বিনষ্ট করতে মাদক এক সর্বনাশা ভূমিকা পালন করে চলেছে। অথচ এই বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় যে স্তরের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সামাজিক সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার চরম অভাব দেখা যাচ্ছে।
Advertisement
Advertisement

​আমাদের দেশের চিত্রটি আরও আশঙ্কাজনক। পুলিশ প্রশাসনের তথ্যমতে, দেশের সংঘটিত ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের মতো অধিকাংশ অপরাধের পেছনেই রয়েছে মাদকাসক্তির পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ যোগসূত্র। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ নিজে মাদক উৎপাদক দেশ না হয়েও অবস্থানগত কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপ্রবণ। দক্ষিণ-পূর্বে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসকে নিয়ে গঠিত ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ এবং উত্তর-পশ্চিমে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরানকে নিয়ে গঠিত ‘গোল্ডেন ক্রিসেন্ট’ এর মাঝামাঝি ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানে বাংলাদেশের অবস্থান। এই অঞ্চলের সীমান্তজুড়ে থাকা মাদক চক্রগুলোর তৎপরতা বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সীমান্ত সুরক্ষায় যে দৃঢ়তা ও সতর্কতা থাকা উচিত ছিল, বাস্তবে সেখানে আমরা বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছি।

​মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক জাতীয় গবেষণার চিত্র আমাদের শঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সেই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ। এর বড় একটি অংশই উঠতি বয়সের তরুণ এবং তাদের সিংহভাগই ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই এই অন্ধকার জগতে পা বাড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত যুবসমাজের চরম অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। মাদক আজ আর শহরের নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি মফস্বল ও গ্রামপর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো সমাজকে ভেতর থেকে পচিয়ে দিচ্ছে।

Advertisement

​গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে ব্যবহারকারী হিসেবে গাঁজার অবস্থান শীর্ষে। এর পরপরই রয়েছে ইয়াবা, হিরোইন, ফেনসিডিল এবং ইনজেকশনের মাধ্যমে নেওয়া মাদকের দাপট। একসময়ের বহুল আলোচিত ফেনসিডিলের জায়গা দখল করে নিয়েছে নিত্যনতুন সিন্থেটিক ও ভয়াবহ সব মাদক। বিশেষ করে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন এক ডেঞ্জার সিগন্যাল। সীমান্তে মাদকের সহজলভ্যতা, ভুল সঙ্গ, কৌতূহল এবং পারিবারিক অশান্তির জেরে আমাদের কিশোর ও তরুণরা লক্ষ্যচ্যুত হয়ে এই মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে।

​অধিকাংশ মাদকাসক্ত ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত। আমাদের দেশে তাদের উপযুক্ত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রতুল। চিকিৎসা ও সামাজিক পুনর্বাসনের সুযোগ না থাকায় সুস্থ হয়ে ওঠার পরও অনেকে আবার পুরোনো অভ্যাসে ফিরে যাচ্ছে।

​মাদক সংকটকে কেবল আইন-শৃঙ্খলা বা অপরাধের চশমায় না দেখে একে একটি ‘জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট’ হিসেবে বিবেচনা করা এখন সময়ের দাবি।

 

​কেবল পুলিশি অভিযান বা কঠোর আইন প্রয়োগ করে এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। সীমান্তে চোরাচালান বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন। পরিবারকে সন্তানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে এবং খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে। তরুণ সমাজকে যদি এখনই এই ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা না যায়, তবে জাতির ভবিষ্যৎ এক গভীর অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। দেশ ও সমাজকে রক্ষা করতে মাদকবিরোধী এই লড়াইকে একটি জরুরি জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতেই হবে।

Advertisement