রংপুর ১১:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
News Title :
কামারপুকুরের ৭ নং ওয়ার্ডের জনপ্রিয় ব্যক্তি আশরাফুল আলম আলোচনায় শীর্ষে সম্পাদকীয় – ডেঙ্গু বাড়ছে, দেশের প্রায় সকল অঞ্চলেই বিস্তার জলঢাকায় লাশের  গাড়ি নিয়ে সড়ক অবরোধ জলঢাকায় লাশ বহনকারী গাড়ি নিয়ে রাস্তা অবরোধ করে খুনিদের বিচারের দাবীতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন উন্নয়নের অঙ্গীকার নিয়ে মাঠে রাজু হোসেন পাটগ্রাম সীমান্তে পথভ্রষ্ট কিশোরীকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর সৈয়দপুরে যাত্রীবাহী বাস থেকে ১৫ কেজি গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার ‘গুপ্ত, দোসর ও জামায়াতের সঙ্গে আঁতাতমুক্ত’ কমিটি চান নীলফামারীর তৃণমূল নীলফামারীতে নিষিদ্ধ পলিথিনবিরোধী অভিযান, জরিমানা কিশোরগঞ্জে মাদ্রাসায় ২৩ শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগে জালিয়াতির অভিযোগ

সম্পাদকীয় – ডেঙ্গু বাড়ছে, দেশের প্রায় সকল অঞ্চলেই বিস্তার

ডেঙ্গু বাড়ছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই এই আতঙ্ক নতুন করে ফিরে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানী ঢাকা কিংবা বর্ষাকেন্দ্রিক একটি রোগ নয়। সময়ের সঙ্গে দেশের প্রায় সকল অঞ্চলেই এর বিস্তার ঘটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন বছরজুড়ে এবং দেশব্যাপী জনস্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে ডেঙ্গু মোকাবিলার কৌশলও বদলানো জরুরি। শুধু বর্ষা শুরু হলে মশক নিধন অভিযান, ফগিং কিংবা সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সারা বছর ধরে পরিকল্পিত, বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০২৩ সাল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, সে বছর দেশে ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুর সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৩ সালের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কতটা শিক্ষা নিয়েছি?

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। ঘরের ভেতর-বাইরে জমে থাকা পরিষ্কার পানিও এডিস মশার প্রজননের উপযোগী হতে পারে। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল, পুরোনো টায়ার, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন কিংবা বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও উৎসস্থল ধ্বংস, পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত পানি সংরক্ষণের পাত্র পরিষ্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

এখানেই শুধু সিটি করপোরেশন / পৌরসভার দায়িত্ব শেষ নয়। বাড়ির মালিক, ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিক সবার দায়িত্ব রয়েছে। একটি বাড়ির আঙিনায় জমে থাকা পানি যেমন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তেমনি নির্মাণাধীন ভবনের একটি ছোট পানির পাত্রও আশপাশের মানুষের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে।

তাই মশক নিধনকে শুধু ওষুধ ছিটানোর কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। লার্ভা কোথায় জন্ম নিচ্ছে, কোন এলাকায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোথায় রোগী বাড়ছে এসব তথ্যের ভিত্তিতে এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশা নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষাকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের কথা বলেছে।

আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো ঢাকাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি। ডেঙ্গু যখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ যেন দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জেলা হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়লে অতিরিক্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, চিকিৎসা সামগ্রী ও প্রশিক্ষিত জনবলের প্রস্তুতিও রাখতে হবে।

কারণ ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শুধু রোগ শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; গুরুতর রোগীকে দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক নির্দেশনাতেও দ্রুত রোগ নির্ণয়, রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং গুরুতর অবস্থায় যথাযথ চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা তাই আরও কার্যকর করা দরকার। নিয়মিত মশার প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি এসব কাজকে নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত করতে হবে। শুধু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পর তৎপর হলে চলবে না।

একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নিজের বাড়ি পরিষ্কার রেখে পাশের বাড়ির জমে থাকা পানি উপেক্ষা করলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। কারণ এডিস মশার জন্য প্রশাসনিক সীমানা কোনো বাধা নয়। একটি এলাকায় রোগের সংক্রমণ বাড়লে তার প্রভাব আশপাশের এলাকাতেও পড়তে পারে।

গণমাধ্যমেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো নয়, বরং মানুষকে সঠিক তথ্য দেওয়া দরকার। কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, কীভাবে মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়, কোথায় পরীক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়া যায় এসব তথ্য নিয়মিতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে মৌসুমি কর্মসূচি হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, বাড়তে থাকা নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সবকিছুর সঙ্গে ডেঙ্গুর ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। WHO-ও জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাত ও নগরায়ণের সঙ্গে এডিস মশার বিস্তারের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে।

প্রতিবছর ডেঙ্গু বাড়বে, মানুষ হাসপাতালে যাবে, মৃত্যুর খবর আসবে এবং এরপর নতুন করে অভিযান শুরু হবে এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, নিয়মিত নজরদারি, প্রজননস্থল ধ্বংস, শক্তিশালী স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল মশার বিরুদ্ধে লড়াই নয়; এটি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা। এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কাজে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

কারণ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর সময় রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর নয় তার অনেক আগেই, যখন এডিস মশার প্রজননস্থলটি ধ্বংস করা সম্ভব। সেই জায়গাতেই যদি আমরা কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারি, তবেই প্রতিবছরের ডেঙ্গু আতঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তব পথ তৈরি হবে।

Popular Post

কামারপুকুরের ৭ নং ওয়ার্ডের জনপ্রিয় ব্যক্তি আশরাফুল আলম আলোচনায় শীর্ষে

সম্পাদকীয় – ডেঙ্গু বাড়ছে, দেশের প্রায় সকল অঞ্চলেই বিস্তার

Update Time : ০৯:২০:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ডেঙ্গু বাড়ছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই এই আতঙ্ক নতুন করে ফিরে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানী ঢাকা কিংবা বর্ষাকেন্দ্রিক একটি রোগ নয়। সময়ের সঙ্গে দেশের প্রায় সকল অঞ্চলেই এর বিস্তার ঘটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন বছরজুড়ে এবং দেশব্যাপী জনস্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে ডেঙ্গু মোকাবিলার কৌশলও বদলানো জরুরি। শুধু বর্ষা শুরু হলে মশক নিধন অভিযান, ফগিং কিংবা সচেতনতামূলক প্রচার চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সারা বছর ধরে পরিকল্পিত, বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ২০২৩ সাল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, সে বছর দেশে ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুর সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৩ সালের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কতটা শিক্ষা নিয়েছি?

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। ঘরের ভেতর-বাইরে জমে থাকা পরিষ্কার পানিও এডিস মশার প্রজননের উপযোগী হতে পারে। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের বোতল, পুরোনো টায়ার, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন কিংবা বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও উৎসস্থল ধ্বংস, পানি জমতে না দেওয়া এবং নিয়মিত পানি সংরক্ষণের পাত্র পরিষ্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

এখানেই শুধু সিটি করপোরেশন / পৌরসভার দায়িত্ব শেষ নয়। বাড়ির মালিক, ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিক সবার দায়িত্ব রয়েছে। একটি বাড়ির আঙিনায় জমে থাকা পানি যেমন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তেমনি নির্মাণাধীন ভবনের একটি ছোট পানির পাত্রও আশপাশের মানুষের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে।

তাই মশক নিধনকে শুধু ওষুধ ছিটানোর কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। লার্ভা কোথায় জন্ম নিচ্ছে, কোন এলাকায় মশার ঘনত্ব বেশি, কোথায় রোগী বাড়ছে এসব তথ্যের ভিত্তিতে এলাকাভিত্তিক ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশা নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষাকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের কথা বলেছে।

আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো ঢাকাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি। ডেঙ্গু যখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ যেন দ্রুত ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে পারেন, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জেলা হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়লে অতিরিক্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, চিকিৎসা সামগ্রী ও প্রশিক্ষিত জনবলের প্রস্তুতিও রাখতে হবে।

কারণ ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শুধু রোগ শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; গুরুতর রোগীকে দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক নির্দেশনাতেও দ্রুত রোগ নির্ণয়, রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং গুরুতর অবস্থায় যথাযথ চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা তাই আরও কার্যকর করা দরকার। নিয়মিত মশার প্রজননস্থল চিহ্নিতকরণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি এসব কাজকে নিয়মিত কার্যক্রমে পরিণত করতে হবে। শুধু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার পর তৎপর হলে চলবে না।

একই সঙ্গে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নিজের বাড়ি পরিষ্কার রেখে পাশের বাড়ির জমে থাকা পানি উপেক্ষা করলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব নয়। কারণ এডিস মশার জন্য প্রশাসনিক সীমানা কোনো বাধা নয়। একটি এলাকায় রোগের সংক্রমণ বাড়লে তার প্রভাব আশপাশের এলাকাতেও পড়তে পারে।

গণমাধ্যমেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো নয়, বরং মানুষকে সঠিক তথ্য দেওয়া দরকার। কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, কীভাবে মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়, কোথায় পরীক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়া যায় এসব তথ্য নিয়মিতভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে মৌসুমি কর্মসূচি হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, বাড়তে থাকা নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সবকিছুর সঙ্গে ডেঙ্গুর ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। WHO-ও জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাত ও নগরায়ণের সঙ্গে এডিস মশার বিস্তারের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছে।

প্রতিবছর ডেঙ্গু বাড়বে, মানুষ হাসপাতালে যাবে, মৃত্যুর খবর আসবে এবং এরপর নতুন করে অভিযান শুরু হবে এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, নিয়মিত নজরদারি, প্রজননস্থল ধ্বংস, শক্তিশালী স্থানীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল মশার বিরুদ্ধে লড়াই নয়; এটি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধেরও পরীক্ষা। এখন প্রয়োজন কথার চেয়ে কাজে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।

কারণ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর সময় রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর নয় তার অনেক আগেই, যখন এডিস মশার প্রজননস্থলটি ধ্বংস করা সম্ভব। সেই জায়গাতেই যদি আমরা কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারি, তবেই প্রতিবছরের ডেঙ্গু আতঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসার বাস্তব পথ তৈরি হবে।