
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সামাজিক সমস্যা নয়; বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং হত্যার মতো অপরাধের খবর প্রায় নিয়মিতই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসছে। এসব ঘটনা শুধু একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে না, বরং সমাজের নিরাপত্তা, মূল্যবোধ ও বিচারব্যবস্থার ওপরও বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রকাশিত পর্যবেক্ষণেও নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার চিত্র উঠে এসেছে। আসক নারী ও শিশু নির্যাতনের বিভিন্ন ধরন আলাদাভাবে নথিভুক্ত করছে। এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত আসকের তথ্যে অন্তত ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ৪৬ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল; একই সময়ে ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অন্তত ১৭ শিশুর মৃত্যুর কথাও জানানো হয়।
তবে পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যা আসলে একটি মানুষের জীবন, একটি পরিবারের কান্না এবং একটি ভবিষ্যতের বিপর্যয়ের গল্প। একটি ধর্ষণের ঘটনা শুধু একজন নারী বা শিশুর শারীরিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানসিক আঘাত, সামাজিক চাপ, নিরাপত্তাহীনতা এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও আইনি লড়াই। বিশেষ করে শিশু ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অপরাধ সংঘটনের পর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ অনেক ভুক্তভোগীর জন্য সহজ নয়। মামলা করা থেকে শুরু করে তদন্ত, চিকিৎসা পরীক্ষা, সাক্ষ্য, আদালতের কার্যক্রম এবং রায় পর্যন্ত দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের ওপর অতিরিক্ত মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। আসকও শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার এবং তদন্তকে স্বাধীন, স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মূল ধারণাই হলো নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, পুলিশি ও আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, আশ্রয় এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সেবা এক জায়গা থেকে দেওয়া। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেল গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করে ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া যায়।
কিন্তু শুধু প্রতিষ্ঠান স্থাপন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। একজন নির্যাতিত নারী বা শিশুকে যখন এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরতে হয়, তথ্যের জন্য বারবার আবেদন করতে হয় কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও আইনি সহায়তার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়, তখন সেবাব্যবস্থার উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে। সরকারি সেবার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর সমন্বয়, প্রশিক্ষিত জনবল, দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা, মানসিক কাউন্সেলিং এবং আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং। অনেক পরিবার জানেই না কোথায় অভিযোগ করতে হবে, কীভাবে আইনি সহায়তা পাওয়া যায় কিংবা নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর জন্য কোন সরকারি সেবা রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু হলেও ইন্টারনেট সুবিধার সীমাবদ্ধতা, ডিজিটাল জ্ঞানের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য না জানার কারণে অনেক মানুষ সেসব সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন না। ফলে শহর ও গ্রামের মধ্যে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ অবস্থায় আইনি সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত ও মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন। আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে হবে এবং দরিদ্র ও অসচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় সময়সীমা মেনে কাজ করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার।
তবে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা আদালতের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবারকে শিশুদের নিরাপত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি ও নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। গণমাধ্যমকে ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করতে হবে।
সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন। নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুকে দোষারোপ করা, তাকে সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা ঘটনা গোপন রাখার চাপ দেওয়া অপরাধীদেরই পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে। নির্যাতনের দায় ভুক্তভোগীর নয় এই মৌলিক সত্যটি পরিবার থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি তাদের মৌলিক অধিকার। একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই সমাজে একজন নারী কতটা নিরাপদে চলতে পারেন, একটি শিশু কতটা নিশ্চিন্তে বেড়ে উঠতে পারে এবং নির্যাতনের শিকার একজন মানুষ কত দ্রুত ন্যায়বিচার ও সহায়তা পেতে পারেন এসবও একটি রাষ্ট্রের মানবিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
তাই এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা। দ্রুত তদন্ত, কার্যকর আইনি সহায়তা, সহজলভ্য চিকিৎসা, মানসিক পুনর্বাসন, নিরাপদ আশ্রয়, ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া এবং সামাজিক সচেতনতা সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি অপরাধ প্রতিরোধ করা নয়; এর অর্থ একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা। আজকের একটি শিশুকে নিরাপদ রাখতে পারলে আগামী দিনের একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। আর সেই দায়িত্ব শুধু সরকারের নয় পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নাগরিক সমাজসহ সবার।
মাহাদী হাসান মানিক 






















