মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) নীলফামারী জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মাদকের একটি বড় চালান পঞ্চগড় অভিমুখে যাচ্ছে—এমন একটি গোপন সংবাদ আগে থেকেই তাদের কাছে ছিল। এই সংবাদের ভিত্তিতে নীলফামারী জেলা কার্যালয়ের ‘খ’ সার্কেলের একটি বিশেষ টিম সৈয়দপুর শহরের ওয়াপদা এলাকায় অবস্থান নেয়। রাত বাড়ার সাথে সাথে মহাসড়কে নজরদারি জোরদার করা হয়।
রাত আনুমানিক গভীর হওয়ার পর চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা এবং পঞ্চগড় অভিমুখী ‘প্রিয়ম’ পরিবহন নামের একটি যাত্রীবাহী বাস ওয়াপদা মোড় এলাকায় পৌঁছালে ডিএনসি সদস্যরা বাসটি থামানোর সংকেত দেয়। বাসটি থামার পর কর্মকর্তারা ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সন্দেহভাজন যাত্রী হিসেবে খালেকুলকে চিহ্নিত করেন।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে খালেকুল কিছুটা ঘাবড়ে গেলেও পরে তার সাথে থাকা স্কুল ব্যাগে তল্লাশি চালায় ডিএনসি টিম। তল্লাশিকালে ব্যাগটির ভেতর অত্যন্ত সুকৌশলে লুকিয়ে রাখা অবস্থায় মোট ৪ হাজার ৮০০ পিস লালচে রঙের ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতে, এই বিশাল পরিমাণ ইয়াবার বাজারমূল্য কয়েক লক্ষ টাকা।
গ্রেফতারকৃত মোহাম্মদ খালেকুল ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার বড় পলাশবাড়ি নয়া দলুয়া এলাকার মোহাম্মদ আসলামের ছেলে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, সে দীর্ঘদিন ধরে এই মাদক চোরাচালান চক্রের সাথে জড়িত এবং বাহক হিসেবে কাজ করে আসছিল।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নীলফামারী ‘খ’ সার্কেলের উপ-পরিদর্শক সাকিব সরকার এই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানান, উদ্ধারকৃত মাদকসহ আসামিকে রাতেই হেফাজতে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে সৈয়দপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মামলা নম্বর ২১। আসামিকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলতে আমাদের এই ধরনের আকস্মিক ও গোপন অভিযান নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। সীমান্ত এলাকা ও মহাসড়কগুলোকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে যাতে যুবসমাজকে এই মরণনেশা থেকে রক্ষা করা যায়।”
সৈয়দপুর একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হওয়ায় মাদক ব্যবসায়ীরা প্রায়ই এই রুটটি ব্যবহার করার চেষ্টা করে। স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ৪৮০০ পিস ইয়াবা ধরা পড়া মানে হাজার হাজার তরুণকে অন্ধকারের হাত থেকে রক্ষা করা। তবে শুধু গ্রেফতার করলেই হবে না, এই ব্যবসার মূল হোতাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইয়াবার মতো ভয়াবহ মাদক উত্তরাঞ্চলে প্রবেশ করায় সামাজিক অপরাধ ও অস্থিরতা বাড়ছে। পরিবারের বড় সন্তানদের চলাফেরার ওপর নজর রাখা এবং মাদকের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
নীলফামারী জেলা প্রশাসন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যৌথভাবে জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে নিয়মিত তল্লাশি চৌকি বসানোর পরিকল্পনা করছে। বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাকে করে যাতে মাদক পাচার হতে না পারে, সে জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সৈয়দপুরের এই সফল অভিযানটি মাদক চোরাকারবারিদের জন্য একটি কড়া বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরাধীরা যত কৌশলীই হোক না কেন, প্রশাসনের নজরদারি এড়ানো যে সহজ নয়, এই গ্রেফতার তারই প্রমাণ। সাধারণ মানুষ আশা করছেন, সামনের দিনগুলোতে নীলফামারী জেলাকে পুরোপুরি মাদকমুক্ত করতে প্রশাসন আরও কঠোর ভূমিকা পালন করবে। এই ইয়াবা চালানের নেপথ্যে আর কারা জড়িত এবং এর গন্তব্য কোথায় ছিল, তা নিয়ে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে।