ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রতিনিয়ত এমন অসংখ্য ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে দেখা যায় দুটি ভারী বাস কিংবা বেপরোয়া মোটরসাইকেল একে অপরকে টপকে যাওয়ার মরণজয়ী প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আরও ভীতিপ্রদ বিষয় হলো, এসব ভিডিওতে চালক, সহকারী বা পেছনের আরোহীদের উল্লাস ও উৎসাহমূলক মন্তব্য শোনা যায়। যে সড়ক দুর্ঘটনা মানুষের বুকে কাঁপন ধরানোর কথা, ডিজিটাল দুনিয়ায় তা আজ পরিণত হয়েছে সস্তা বিনোদনের উপাদানে। শুধু তা-ই নয়, এই প্রাণঘাতী কনটেন্টগুলো বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে এবং ‘মনিটাইজেশন’-এর মাধ্যমে আর্থিক লাভের উৎস হয়ে উঠছে। ফলে, কৃত্রিম এই জনপ্রিয়তার লোভে পড়ে অন্য তরুণেরাও একই ধরনের আত্মঘাতী আচরণে উৎসাহিত হচ্ছে, যা একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গতি ও এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় শতগুণ। বাস্তব পরিসংখ্যানও সেই নির্মম সত্যকেই বারবার সামনে আনছে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও পঙ্গুত্বের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, যার অন্যতম প্রধান কারণ এই বেপরোয়া মানসিকতা। তাই বিষয়টিকে আর কেবল ‘দুর্ঘটনা’ বা চালকের ব্যক্তিগত ভুল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন একটি গভীর সামাজিক ও নিরাপত্তাগত ব্যাধি।
এখানে একটি আইনি প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক : সামাজিকমাধ্যমে দৃশ্যমান এই অপরাধের ভিডিওগুলো কি আইনগত প্রমাণ হিসেবে গণ্য হতে পারে?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান ডিজিটাল ও দণ্ডবিধির আওতায় জননিরাপত্তা বিপন্নকারী এসব কর্মকাণ্ডের ভিডিও বিশ্লেষণ করে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণের মাধ্যমে অতি সহজেই এই ‘ভাইরাল অপরাধীদের’ চিহ্নিত করা সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশেই এখন সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের ভিডিও দেখে ট্রাফিক পুলিশ আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে, যা আমাদের দেশেও অবিলম্বে পুরোদমে শুরু করা দরকার।
তবে শুধু শাস্তির ভয় দেখিয়ে এই সংস্কৃতি রাতারাতি বদলানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ:
কঠোর নজরদারি: মহাসড়কগুলোতে পর্যাপ্ত ও সচল ‘স্পিড ক্যামেরা’ স্থাপন করতে হবে।
দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ: পরিবহন মালিক ও চালক সমিতিকে এই চালকদের বেপরোয়া আচরণের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
ডিজিটাল রিপোর্টিং: সামাজিকমাধ্যমগুলোতে বিপজ্জনক ও আইনলঙ্ঘনকারী কনটেন্টগুলোর প্রচার বন্ধে কঠোর অ্যালগরিদম ও রিপোর্টিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
সড়ক কোনো প্রতিযোগিতার মঞ্চ বা বিনোদনের স্টুডিও নয়; এটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকার লাইফলাইন। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের সস্তা ‘ভাইরাল’ হওয়ার তৃষ্ণা যদি তরতাজা মানুষের প্রাণের বিনিময়ে মেটাতে হয়, তবে সেই প্রযুক্তির চেয়ে বড় অভিশাপ আর কিছু হতে পারে না। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং মৃত্যুর এই ভার্চুয়াল প্রতিযোগিতা চিরতরে বন্ধ করতে প্রশাসন, কনটেন্ট নির্মাতা এবং সাধারণ দর্শক, সবাইকে এখনই একযোগে সচেতন ও কঠোর হতে হবে।