
কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত নিচতলার একটি ফ্রিজে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ ও তদন্ত কমিটি। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়লে রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। রিসোর্টের গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ মজুত থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত এখনো চলছে।
গত ১৭ অক্টোবর সকালে ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যু হয়। আগুনে রিসোর্টটির বড় একটি অংশ পুড়ে যায়। ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা, নির্মাণকাঠামো এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, গ্রেফতার রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিচতলার একটি ফ্রিজে শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। পরে আগুন রান্নাঘরে ছড়িয়ে পড়লে গ্যাস সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে। রিসোর্টের গুদামে দাহ্য রাসায়নিক পদার্থ ছিল। তীব্র বাতাস ও কাঠের অবকাঠামোর কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে গুদামে কী ধরনের রাসায়নিক পদার্থ রাখা হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উখিয়া থানার উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ বলেন, আগুনের সূত্রপাত নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে আরও সময় প্রয়োজন। তদন্তের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত এবং পরে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে সামনে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
প্রায় ২০ শতক জমির ওপর নির্মিত রিসোর্টটির কক্ষের মেঝে, দেয়াল ও সিঁড়ির বড় অংশ কাঠ দিয়ে তৈরি ছিল। সড়কের দিকে গাছের খুঁটির ওপর রেস্তোরাঁর বর্ধিত অংশও নির্মাণ করা হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডে এসব স্থাপনার বড় অংশ পুড়ে যায়। আগুনের দ্রুত বিস্তারে কাঠের অবকাঠামোর ভূমিকা ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
তিন সংস্থার অনুমোদন ছিল না
রিসোর্টটির ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স থাকলেও ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল না বলে জানা গেছে। অগ্নিকাণ্ডের পর বিষয়টি সামনে আসায় প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ও কার্যক্রমের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
জালিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম ছৈয়দ আলম জানান, নির্ধারিত ফি নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে টুপটুপ রিসোর্টের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। গত ২২ জুলাই রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়ার নামে লাইসেন্সটি ইস্যু করা হয়। এতে তাঁর ঠিকানা চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মীরপাড়া উল্লেখ করা হয়েছে। লাইসেন্সের মেয়াদ চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। ফি, মূল্য সংযোজন কর ও বাণিজ্যিক কর মিলিয়ে দুই হাজার টাকা আদায় করা হয়।
তবে ট্রেড লাইসেন্স থাকলেই রিসোর্ট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন সম্পন্ন হয় না। অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক সংযোগ, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবস্থাপনা, দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা ছিল কি না, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
মালিক পলাতক, গ্রেফতার সহকারী ব্যবস্থাপক
অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে রিসোর্টের মালিক ও মামলার প্রধান আসামি মো. তানভীর সুলতান মিয়া পলাতক রয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তিনি বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করছেন। আরেক মালিক নেওয়াজ মোরশেদসহ অন্যরাও আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো শুনানি হয়নি।
নিখোঁজ পর্যটক নিয়ে ভিন্ন তথ্য
অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে কতজন পর্যটক ছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে কেউ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন কি না, তা নিয়ে স্বজন ও পুলিশের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
স্বজনদের দাবি, ১৬ অক্টোবর রাতে নারী ও শিশুসহ ২১ জন পর্যটক রিসোর্টে ছিলেন। পরদিন ভোরে আইরিন জাহান ও ইসরাত জাহান সৈকতে বেড়াতে গেলে রিসোর্টে ১৯ জন অবস্থান করছিলেন। তাঁদের হিসাবে, ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, ছয়জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং দুজন লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। তাঁদের দাবি, আরও একজনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
তবে উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও গ্রেফতার সহকারী ব্যবস্থাপকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগুনের সময় আটটি কক্ষে ১৯ জন অতিথি ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, সাতজন আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং দুজন লাফ দিয়ে রক্ষা পেয়েছেন। এই ১৯ জনের বাইরে কেউ নিখোঁজ রয়েছেন, এমন তথ্য তদন্তে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে লিখিত দাবিও আসেনি।
জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, ১০টি মরদেহ উদ্ধারের পর আরও একজন নিখোঁজ থাকার বিষয়টি সামনে আসে। পরে ফায়ার সার্ভিস আবারও তল্লাশি চালালেও কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনায় আগুনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা, অনুমোদন, দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ এবং সম্ভাব্য অবহেলার বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অনলাইন ডেস্ক 

















