মানুষের জীবনের শেষ ঠিকানা কবর। মৃত্যুর পর যেখানে পরম শান্তিতে শায়িত থাকার কথা, সেই স্থানও আজ লোভী ও নিষ্ঠুর মানুষের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অরক্ষিত কবরস্থান থেকে মানুষের কঙ্কাল চুরি করে তা প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করার এক ভয়াবহ চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই অন্ধকার বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে খোদ চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীর নাম।
রাজধানীর তেজগাঁও ও উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়ে কঙ্কাল চোর চক্রের চার সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৪৭টি মানুষের মাথার খুলি এবং শরীরের বিভিন্ন অংশের হাড়গোড়।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে এক শিউরে ওঠা বাস্তবতা। চক্রটির সদস্যরা মূলত গাজীপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও জামালপুর জেলার অরক্ষিত এবং নির্জন কবরস্থানগুলোকে টার্গেট করত।
সাধারণত দাফনের এক বছর পর, যখন মৃতদেহের শরীর মাটির সঙ্গে মিশে যায়, তখনই তারা গভীর রাতে কবর খুঁড়ে কঙ্কাল সংগ্রহ করত। যেসব কবরস্থানে সিসি ক্যামেরা বা প্রহরীর নজরদারি ছিল না, সেগুলোই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য।
মাঠপর্যায় থেকে এসব কঙ্কাল তারা মাত্র ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায় সংগ্রহ করত। এরপর রাসায়নিক ব্যবহার করে পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাত করে প্রতিটি কঙ্কাল ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হতো।
গ্রেফতার হওয়া চারজনের মধ্যে কাজী জহুরুল ইসলাম সৌমিক (২৫) উত্তরার সাপ্পোরো ডেন্টাল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। অন্যজন ফয়সাল আহম্মেদ (২৬) একই কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ইন্টার্নশিপের অপেক্ষায় ছিলেন। মূলত মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কঙ্কালের চাহিদাকে কাজে লাগিয়েই তারা এই অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে আসছিল।
গ্রেফতার হওয়া অন্য দুই সদস্য হলেন আবুল কালাম (৩৯) ও আসাদুল মুন্সী জসিম এরশাদ (৩২)। তাদের মধ্যে আবুল কালামের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের কঙ্কাল চুরির মামলাসহ মোট ২১টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে আরও জানা গেছে, চক্রটির কার্যক্রম ছিল সুসংগঠিত। তাদের একটি অনলাইন হোলসেলিং গ্রুপ রয়েছে, যেখানে প্রায় ২০ হাজার সদস্য যুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে প্রায় ৭০০ জন। কোনো ক্রেতা কঙ্কালের অর্ডার দিলে এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে তা সংগ্রহ করে সরবরাহ করা হতো।
তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত। তারা কেউ কেউ ইতোমধ্যে ২০ থেকে ৫০টি পর্যন্ত কঙ্কাল বিক্রির কথা স্বীকার করেছেন।
তিনি আরও জানান, যদি কোনো ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করেন, তাহলে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে উদ্ধার করা কঙ্কালগুলো শনাক্ত করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল কবর পর্যন্ত যখন নিরাপদ নয়, তখন এই ঘটনা সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। মানবিকতা ও নৈতিকতার প্রশ্নে এই ঘটনা গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।