রক্তঝরা সেই ১৯৫২ সালের স্মৃতি অমলিন রেখে সারা দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে গণতন্ত্র ও অধিকার আদায়ের নতুন প্রত্যয়ে রাজধানীসহ সারা দেশের রাজপথ আজ মিশে গিয়েছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে। ধর্ম-বর্ণ-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের পদভারে মুখরিত ছিল বাঙালির এই আবেগের আঙিনা।
শনিবার রাত ১২টা ১ মিনিটে ঘড়ির কাঁটা ছোঁয়ার আগেই নিস্তব্ধতা ভেঙে জেগে ওঠে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা। প্রথম প্রহরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তার ঠিক সাত মিনিট পরেই রাত ১২টা ৮ মিনিটে শহীদ মিনারের বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এসময় তার সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর বিএনপি এবং জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এরপর রাত ১২টা ১০ মিনিটের দিকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় জোটের পক্ষ থেকে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
রাতভর শ্রদ্ধার এই স্রোত থামেনি। সেহরি পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। এরপর সকাল সাড়ে ৬টা থেকেই শুরু হয় ঐতিহাসিক ‘প্রভাতফেরি’। খালি পায়ে, পরনে একুশের শোকের প্রতীক সাদা-কালো পোশাক আর হাতে প্রিয় ফুলের তোড়া নিয়ে সারিবদ্ধভাবে এগিয়ে আসে হাজারো মানুষ। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবার কণ্ঠেই ছিল সেই কালজয়ী সুর, “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…”।
বিকেলের মধ্যেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং অসংখ্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নিজ নিজ ব্যানারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
দিবসটি উপলক্ষ্যে আয়োজিত বিভিন্ন আলোচনা সভায় বক্তারা একুশের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বলেন, একুশ মানেই মাথা নত না করা। কেবল ভাষা রক্ষা নয়, বরং এই আন্দোলনের মূল মন্ত্র ছিল গণতন্ত্র এবং মানুষের বাকস্বাধীনতা। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একুশের সেই অদম্য চেতনাকে পাথেয় করে দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয় এসব অনুষ্ঠান থেকে।
পুরো দিনজুড়ে রাজধানীসহ দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও নানাবিধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি অনুষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে ১৯৫২-র ইতিহাস তুলে ধরা হয়।